ভারতের কৃষক বিদ্রোহের গতি-প্রকৃতি

By অনিন্দ্য আরিফ

04,Jan 2021

ভারত সরকার যখন থেকে আর্থিক উদারনীতির আগ্রাসন শুরু হয়েছে, তখন থেকেই দেশটির কেন্দ্রীয় বা অধিকাংশ রাজ্যের সরকারগুলো কৃষি খাতকে দেশি-বিদেশি একচেটিয়া পুঁজির কাছে সমর্পণ করার নীতি বজায় রেখে আসছে। সর্বশেষ ২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার আসার পর তারা এই কৃষি খাতকে আরও তীব্রভাবে এই লুণ্ঠনের মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করেছে। ভারতের কৃষিক্ষেত্রে এখনও ব্যাপক সংখ্যক মানুষ সংযুক্ত, দেশটির অর্থনীতিতে কৃষি এখনও বড় একটি ভূমিকা রাখে। মূলত ইউপিএ জমানা থেকে ভারতের কৃষিকে একচেটিয়া পুঁজির কাছে সমর্পণ করার উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। এ সময়ে মনস্যান্টো, কারগিল প্রভৃতি বহুজাতিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুরু হয় এবং কৃষি-কৃষক সুরক্ষা-খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে প্রশ্নচিহ্নের সম্মুখীন করা হয়। আর এখন করোনা মহামারীর সুযোগ নিয়ে লকডাউন পরিস্থিতির জন্য আর্থিক বিপর্যয়ের সুযোগ নিয়ে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের অ্যাজেন্ডা আগ্রাসন কৃষিতে চাপিয়ে দিতে সচেষ্ট হয়। এদিকে মোদি সরকারও আত্মনির্ভরতার ফাঁপা আওয়াজ দিয়ে ভারতে উদারনীতির তীব্রতাকে জোরদার করার ভূমিকা নিয়েছে। তারা এই নীতিকে আরও বহুদূর প্রসারিত করার উদ্যোগে নিজেদের ব্যাতিব্যস্ত রাখছে। সেই ধারাবহিকতায় এসেছে শ্রম আইন সংস্কার, কয়লা খাত সম্পূর্ণ বেসরকারিকরণ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি। সেই ধারাবাহিকতায় ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে আনা হয়েছে একাধিক সংস্কার, যাকে দু’হাতে জোরালোভাবে তালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে দেশি-বিদেশি কর্পোরেট সংস্থাগুলো।

আগেই বলা হয়েছে, ভারতের অর্থনীতিতে কৃষকের অবদান অনেক। ভারতের প্রায় ১৩৫ কেটি জনগণের অর্ধেকই কৃষি ক্ষেত্রে জড়িত এবং ভারতের ২ দশমিক ৭ ট্রিলয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে ১৫ শতাংশের বেশি অবদান রাখে কৃষি। কিন্তু সরকারের কৃষি ধ্বংসের নীতির ফলে এই কৃষকরা যেমন ঋণে জর্জরিত, তেমনি দুর্বল হার্ভেস্ট এবং খরার কারণেও তারা দারুণ বিপর্যস্ত। পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ যে ২০১৯ সালে কৃষির ওপর নির্ভরশীল প্রায় ২৮ জন গড়ে প্রতিদিন আত্মহত্যা করেছে। তাই মোদি সরকার যখন নতুন কৃষি সংস্কার বিল প্রণয়ন করেছে, তখন তার বিরুদ্ধে আন্দোলতরত কৃষকদের সঙ্গে পাঁচ বছর বয়সী এক কৃষক সন্তানও বিক্ষোভে সামিল হয়েছে।

ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয় কভিড-১৯ এর সময়কালে তড়িঘড়ি করে সরকার প্রণীত নতুন তিনটি কৃষি আইন প্রণয়ন ঘিরে। সরকার অংশীজনদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা ছাড়াই অর্থাৎ কৃষক কিংবা রাজ্য সরকার, তাদের কারো সঙ্গে কোনো ধরনের যুক্তি-পরামর্শ না করেই নয়া কৃষি আইন প্রবর্তন করে।

এই কৃষি আইনে যেসব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে সেসব সংস্কার খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা প্রয়োজন। এই সংস্কারের মধ্যে রয়েছে অত্যাবশকীয় পণ্য আইন সংশোধন করে দানাশস্য, ভোজ্যতেল, তৈলবীজ, ডাল, পিঁয়াজ, আলু সহ সমস্ত খাদ্যশস্যকে অত্যাবশকীয় পণ্য তালিকার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাদের মূল্যকে নিয়ন্ত্রণ করা। এর ফলে খাদ্যের মজুত সম্পর্কে সাধারণ ধারণা রাখতে পারবে না ভারতের জনসাধারণ। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর কাছে কত খাদ্য ভাণ্ডার আছে তা কারো জানা থাকবে না। আর ইচ্ছেমতো দাম বাড়ানো বা কমানোর লাইসেন্স পেয়ে যাবে অসাধু মজুতদাররা। কৃষি সংস্কার আইনের আরেকটি দিক হলো প্রচলিত বাজার ব্যবস্থার অনিবার্যতাকে অপ্রয়োজনীয় করে দিয়ে কৃষি-পণ্যের ক্ষেত্রে ই-কমার্স চালু করা। এর ফলে এতদিন ধরে প্রচলিত মান্ডি ব্যবস্থার পরিবর্তে বিপণন ব্যবস্থার প্রসারের পথ সুগম হলো। ভারতের কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন এর ফলে দুর্নীতির একটা রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, অন্যায্য আর্থিক বিনিময়ের সম্ভাবনা তৈরি করা হলো। তৃতীয়ত, মান্ডির সঙ্গে যুক্ত বিপুল একটা অংশের মানুষ কাজ হারাবেন। চতুর্থত, ওয়ারহাউজ এবং কোল্ড স্টোরগুলির কৃষিপণ্যের বাজারে নতুন ক্রেতা হিসাবে আর্বিভূত হবে এবং তাদের ওপর নজরদারির জন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা থাকবে না। পঞ্চমত, এই অর্ডিনান্সের ফলে কর্পোরেট বহুজাতিক সংস্তাগুলো সদলবলে ভারতের বাজারে প্রবেশ করবে। এই সংস্কারের আরেকটি গুরত্বপূর্ণ দিক হলো চুক্তি চাষ। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে দাদন ও চুক্তি চাষ চালু ছিল। সেই চুক্তি চাষ স্বাধীন ভারতে বিভিন্ন সময়ে নানা সরকার চালু করেছিল। এখন বিজেপি সরকার নতুনভাবে এই পদ্ধতি প্রবর্তন করছে। প্রকৃতঅর্থে, এই চুক্তি চাষকে যতই কৃষকের স্বার্থরক্ষাকারী বলা হোক না কেন, এটা আসলে করপোরেশনের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং কৃষক তাদের দাসে পরিণত হবে।

মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের কৃষকদের অসন্তোষ নতুন নয়। ২০১৮ সালে কৃষকররা ‘মুম্বাই লং মার্চে’ সমবেত হয়। এবার সদ্যবিদায়ী বছরের ২৬ নভেম্বর থেকে তারা দিল্লিতে জড়ো হয়ে দেশটির রাজধানীকে ঘিরে রেখেছে। এখন দিল্লিতে প্রায় ৩৫টি কৃষক সংগঠন এই আন্দোলনেরে নেতৃত্বে রয়েছে। সিপিআইএম, সিপিআই, সিপিআইএম-এল (লিবারেশন), আরএসপি, ফরওয়ার্ড ব্লক,এসইউসিসহ নানা বামপন্থী দল আন্দোলনরত কৃষকদের পাশে রয়েছে। এমনকি গণআন্দোলনের ধারায় বিশ্বাসী নয় ভারতীয় মাওবাদীরাও আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছে। প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস সমর্থন জানিয়েছে। সমর্থন রয়েছে আম আদমি পার্টিরও। অনেকগুলো আঞ্চলিক দলও এই আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়েছে। আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে ভারতের ট্রেড ইউনিয়নগুলো একদিনের সাধারণ ধর্মঘটও পালন করেছে। ভারতের ব্যাংক ইউনিয়নগুলো আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কালো ব্যাজ পরিধান করেছে। মৎস্যজীবীদের সংগঠন, খনি শ্রমিক এবং রেলওয়ে শ্রমিকদের ফেডারেশনও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জ্ঞাপন করেছে। ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলোও আন্দোলনের সঙ্গে রয়েছে।

এই আন্দোলন হিন্দুত্ববাদী বিজেপির মধ্যেও চিড় ধরাচ্ছে। ইতিমধ্যে কৃষকদের সমর্থনে পাঞ্জাবের বিজেপি সাধারণ সম্পাদক এবং দলটির পাঞ্জাব যুব সংগঠনের প্রধান দল থেকে পদত্যাগ করেছে। অনুরূপভাবে হরিয়ানার একজন বিজেপির বিধানসভা সদস্যও পদত্যাগ করেছেন। বিজেপির নেতৃত্বাধীন জোটে থাকা অনেক শরিক দলও এই ইস্যুতে জোট ছাড়ার হুমকি দিচ্ছে। পাঞ্জাবে তাদের শরিক দল সাড পার্টি ইতিমধ্যে জোট ছেড়েছে। একই প্রক্রিয়ায় রয়েছে রাজস্থানের আরএলপি দল। বোঝাই যাচ্ছে, বিজেপি সাম্প্রতিক কৃষক বিদ্রোহের ফলে বেশ বেকায়দায় পড়েছে। 

যতদূর সম্ভব ক্ষুব্ধ এ কৃষকদের সঙ্গে সরকার চুক্তিতে যাওয়ার উপায় খুঁজছে। তবে শুরুর দিকে তারা সামগ্রিক বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীকালে আন্দোলনরত কৃষকদের দুর্বৃত্তবিরোধী শক্তির ইন্ধনে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী হিসেবে আখ্যায়িত করার অপব্যাখ্যার চেষ্টাও বাদ রাখেনি। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনরত শিখ কৃষকদের রাষ্ট্রদ্রোহী ও সন্ত্রাসী অপবাদ দিয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশে সরকারি বাহিনী দিয়ে হামলাও চালানো হয়। কিন্তু কোনোভাবেই ভারতের কৃষক বিদ্রোহকে দমন করা তো যাচ্ছেই না, উপরন্তু এর তীব্রতা মোদির নেতৃত্বাধীন হিন্দুত্ববাদী সরকারকে উত্তরোত্তর সংকটে নিমজ্জিত করছে।

মূলধারার গণমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয়ও কৃষকদের এ গণআন্দোলনকে খাটো করা কিংবা তাদের দাবিগুলোকে দুর্বল করার প্রবণতা চোখে পড়ে, ঠিক যেভাবে তারা ছয় বছর ধরে সব ভিন্নমত বা বিরোধী মতাবলম্বীদের নির্লজ্জভাবে আক্রমণের চর্চায় নিয়োজিত। কিন্তু সাম্প্রতিক কৃষক বিদ্রোহের জোয়ার থামানো যাচ্ছে না। প্রভাত পট্টনায়েকের মতো বিশ্বখ্যাত বামপন্থী অর্থনীতিবিদ কৃষকদের এ লড়াইকে শুধু তাদের লড়াই বলতে নারাজ। তার মতে এটা ভারতীয় ধর্মনিরেপক্ষতা এবং গণতন্ত্র রক্ষারও লড়াই। সেই লড়াইকে কৃষকরা কতদূর নিয়ে যেতে পারবেন, সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। তবে ভারতের সাম্প্রতিক কৃষক বিদ্রোহ আমাদের মতো কৃষিনির্ভর দেশগুলোর জন্য শিক্ষা তৈরি করেছে।

You May Also Like
Image-Description
কিম কি-দুক : কোরিয়ান নিউ ওয়েভের যাযাবর

‘কেউ যদি আমাকে প্রশ্ন করে আমি একজন নৈতিক ব্যক্তি কি না, তাহলে আমি সাধারণত প্রত্যুত্তরে...

31,Dec 2020