ধূমপান কি চরিত্রের জন্য ক্ষতিকর?

By অর্ণব সান্যাল

09,Jan 2021

ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এই বাক্যটি চিরন্তন সত্যের মতো, অনেক জায়গাতেই মেলে। আর বিড়ি-সিগারেটের প্যাকেটে তো অবশ্যই। তবে চিরউর্বরা এই বঙ্গে বরাবরই নতুন তত্ত্ব এসেছে। এবার যে অবস্থা, তাতে সংশয় জাগানিয়া প্রশ্নটি হলো, ধূমপান কি চরিত্রের জন্যও ক্ষতিকর?

সব প্রশ্নেরই একটি উৎস থাকে। এবারের উৎসটি হলো রাজশাহীতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা। সেখানে এক নারী ধূমপান করায় তাঁকে এ দেশের কতিপয় পুরুষের ‘নীতি-নৈতিকতা’ বিষয়ক বক্তৃতা শুনতে হয়েছে। প্রতিবাদ করায় কটু কথাও শোনানো হয়েছে ঢের। শেষে ওই নারীকে সিগারেট ফেলে দিয়ে অকুস্থল ছাড়তে হয়েছে। কারণ তা নাহলে যে আমাদের ‘নীতিবাগীশদের’ হৃদয়ে অক্সিজেনের ঘাটতি হচ্ছিল! এ ঘটনার একটি ভিডিওচিত্র এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।  

আমাদের দেশে কিছু জিনিস একদম বিনামূল্যে মেলে, বিশেষ করে রাস্তা-ঘাটে। আর সেগুলো হলো–বক্তৃতা, পরামর্শ, সমালোচনা, নিন্দা ইত্যাদি। শেষের তিনটি হরহামেশাই পাওয়া যায়, না চাইতেও। এসব দিতে মাথার বুদ্ধি খুব একটা খরচ করতে হয় না হয়তো। কারণ এসব বিলানোর কৌশল খুব সহজ। প্রথমে বিষয় নির্ধারণ করতে হয়। আর তারপর নিজে জীবনেও যা করবেন না বা এড়িয়ে চলবেন, ঠিক সেগুলো অন্যকে মেনে চলার নিদান দিতে হয়। আর নিন্দার কথা কী বলব! ওটি আমাদের সহজাত।

রাজশাহীর ওই নারীকে যে কথাগুলো শুনতে হয়েছিল, তার একটি হলো–তাঁকে ধূমপান করতে দেখলে এলাকার অন্য নারীরা ‘নষ্ট’ হয়ে যেতে পারে। আর এই নষ্ট হওয়ার তত্ত্ব থেকেই আসে শুরুর প্রশ্নটি, ধূমপান কি চরিত্রের জন্যও ক্ষতিকর? স্বাস্থ্যের জন্য যে সর্বতোভাবে ক্ষতিকর, তা নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু চরিত্রের বিষয়টির ওপর ধূমপানের প্রভাব সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। কারণ সেটিই যদি হয়ে থাকে, তবে এ দেশের অনেক পুরুষই চরিত্রহীন। এবং তাদের কারণে হয়তো আরও অনেক পুরুষ ‘নষ্ট’ হয়ে গেছেন। এই দায় যদি শুধুই ধূমপানের জন্য হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের এ দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ ছোটবেলা থেকেই জেনেছি, ভালো মানুষ হতে গেলে, সচ্চরিত্রবান হওয়া প্রয়োজন। তা, দেশের অনেক পুরুষ যদি ধূমপানের কারণে চরিত্র হারিয়ে বসে থাকেন, তবে জাতির কী হবে? নীতিবাগীশদের এ বিষয়টি নিয়েও ভাবা দরকার।

কুচরিত্রের পুরুষ কী করে শুনবেন? আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত সময়ে, এ দেশে যৌতুকের জন্য ৭৪ জন নারীকে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হয়েছে। আর ওই একই সময়ে স্বামীর হত্যার শিকার হয়েছেন ২০৫ জন নারী। কতিপয় নীতিবাগীশদের বক্তব্য মানলে, প্রশ্ন জাগে, এই নির্যাতক পুরুষেরা সবাই কি ধূমপায়ী ছিলেন? ধূমপানের কারণেই কি তাদের এই নির্যাতক রূপ প্রকট হয়েছে?

নাকি, নীতিবাগীশদের মাথায় ছিল, ‘মাইয়ারা কেন পোলাগোর মতো সিগারেট খাইব?’ এ ধরনের প্রশ্নের অবতারণা চোখের সামনে এত হয়েছে যে, একেবারে উদ্ধৃতিসহ তুলে দেওয়া সম্ভব হলো। এই বঙ্গে অনেক কাজই শুধু পুরুষেরা একা করতে চান। নারীরাও সেটি করলে তাতে তাদের আঁতে ঘা লাগে। তাই এখানকার পুরুষদের কাছে ধূমপান ‘সুখটান’, আর নারীরা সেই সুখটানে ভাগ বসালেই সব ‘নষ্ট’ হয়ে যায়।  তবে তাই বলে নারীদের পরোক্ষ ধূমপানের শিকার কম হতে হয় না। প্রত্যক্ষ ধূমপানের তুলনায় তাতে ক্ষতিও বেশি বৈ কম নয়। কিন্তু তাতে পুরুষদের কী-বা এসে গেল। আরে নারীকে হারানোই তো এত সব কাজের গোড়ার নীতি। তাকে দেখিয়ে দেওয়া যে, পুরুষ বলেই আমি যা খুশি তাই করতে পারি!

উন্নত বিশ্বেও একদা এমন পরিস্থিতি ছিল। নারীর ধূমপান পুরুষদের সহ্য করতে না পারার পেছনে তখনও মূল বিষয় ছিল ‘জেন্ডার ইস্যু’। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে নারীদের ধূমপান করাটা ছিল পুরুষদের চক্ষুশূল। তবে নারী অধিকার যত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়েছে, তত পশ্চিমা সমাজ নারী স্বাধীনতাকে মেনে নিয়েছে। সেটি আসলে ছিল ব্যক্তি স্বাধীনতাকে মেনে নেওয়ারই নামান্তর। লিঙ্গ নির্বিশেষে একজন ব্যক্তি কি খাবেন, কি পরবেন, কি করবেন–সেটি একান্তই তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনো সভ্য সমাজ তাতে নাক গলায় না। তবে তাই বলে মানবস্বাস্থ্যের প্রতি ধূমপানের ক্ষতিকর প্রভাব কমে না। কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে ধূমপান নারী ও পুরুষ- উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই সমানভাবে ক্ষতিকর। কারো জন্যই তা ‘সুখটান’ নয়।    

নারীর ধূমপানে পুরুষের গাত্রদাহের সামাজিক ও মানসিক কারণও আছে এবং সেগুলোর সবই বৈষম্যের মোড়কে ঢাকা । যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ার ইনগ্রিড ওয়ালড্রন নামের এক শিক্ষক গত শতাব্দীর শেষ দশকে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষণাপত্রটির নাম ছিল ‘প্যাটার্নস অ্যান্ড কজেজ অব জেন্ডার ডিফারেনসেস ইন স্মোকিং’। তাতে দেখা  গেছে, ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষ অত্যধিক সামাজিক ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হস্তগত করতে চায় এবং সে কারণে সমাজে নারীর আচরণের ওপর বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়। আর এমন প্রবণতা থেকেই সামাজিকভাবে নারীর ধূমপানের বিরোধিতা করা হয়। এখানে ধূমপানের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির বিষয়টি পুরুষের মাথায় থাকে না। অর্থাৎ নারীর ধূমপানের বিরোধিতার পেছনে একটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চিরায়ত সামাজিক বৈষম্যই কলকাঠি নাড়ে। ধূমপান এখানে প্রতীকী, যা দমনের মধ্য দিয়ে নারীর প্রতি বৈষম্যের আরও অনেক ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়। আর সেজন্যই নিয়ে আসা হয় সমাজের চোখে ‘নষ্ট’ হয়ে যাওয়ার তত্ত্ব।

আমাদের সমাজে এ প্রবণতা আরও বেশি। ‘একঘরে’ করাটা এখানে কোনো ব্যক্তিকে ‘সাইজ করার’ অব্যর্থ অস্ত্র। নারীদের ক্ষেত্রে তা প্রবল। কিন্তু হে কতিপয় নীতিবাগীশেরা, ‘নষ্ট’ হওয়ার তত্ত্বের অযথা প্রয়োগে নিজেরাও যে দিন দিন ‘নষ্ট’ হয়ে যাচ্ছেন, সে খেয়াল আছে তো? নইলে কিন্তু একদিন চারপাশে শুধু আবর্জনাই পাবেন। ফুলের সুবাস সেদিন হারিয়ে যাবে সুদূরে।